অপরাধীরা কিছুতেই থামছে না!

নগরীতে তিনদিনে দু’জনকে হত্যা, একজনকে কুপিয়ে জখম

নিজস্ব প্রতিবেদক

খুলনা মহানগরীতে তিনদিনের ব্যবধানে দুই খুন ও একজনকে কুপিয়ে জখমের ঘটনা ঘটেছে। একের পর এক নৃশংস ঘটনা ঘটলেও কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ। তাদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে বলে প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। তাছাড়া প্রতিদিন নগরীতে চলছে নীরব চাঁদাবাজি। এসব কারণে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছে নাগরিক সমাজ।

জানা গেছে, ২৬ জুলাই রাতে আড়ংঘাটা থানার পাহারপুর এলাকার বাসিন্দা সোবহান শেখের ছেলে ইমন শেখ রাতের খাবার খেয়ে ঘরে ঘুমিয়ে পড়ে। ওইদিন রাত থেকে নিখোঁজ হয় সে। সকালে পরিবারের সদস্যরা বিভিন্নস্থানে খোঁজ নেয়। কিন্তু তার সন্ধান না পেয়ে সদস্যরা হতাশ হয়ে বাড়িতে ফিরে আসে। ২৭ জুলাই সন্ধ্যা সোয়া ৬টার দিকে উল্লিখিত থানার রেলস্টেশনের দক্ষিণ পাশের একটি ঘেরের রাস্তার ওপর থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ঘটনার একদিন পর নিহত ইমন শেখের মা বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে থানায় মামলা দায়ের করেন। এ ঘটনায় এখনও পর্যন্ত কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ। আসামি গ্রেপ্তার না হওয়ায় পরিবারের সদস্যরা রীতিমতো আতঙ্কের মধ্যে রয়েছে।

একই দিন দুপুরে লবণচরা থানার রূপসা রিভারভিউ ইকোপার্কের সামনে সন্ত্রাসীরা আরিফ শিকদার নামের এক যুবককে প্রকাশ্যে গুলি ও কুপিয়ে জখম করে। ঘটনার দিন আহত যুবক ও তার বন্ধুদের নিয়ে ঘটনাস্থলের পাশে একটি চৌকিতে বসে গল্প করছিল। এসময় সন্ত্রাসীরা তাকে লক্ষ্য করে গুলি চালায়। গুলি তার বুকে বিদ্ধ হলে সে মাটিতে পড়ে যায়। এরপর তার বাম ও ডান পায়ে ধারালো অস্ত্র দিয়ে একাধিক আঘাত করা হয়। পরে তাকে উদ্ধার করে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। এ ঘটনায় ভয়ে পরিবারের পক্ষ থেকে থানায় কোনো মামলা করেনি। এমন কী হামলা সম্পর্কেও কোনো ধরনের তথ্য দিয়ে পুলিশকে সহযোগিতা না করার কথাও শোনা যাচ্ছে। এ ঘটনায় পুলিশ কাউকে আটক করতে পারেনি। আহত আরিফ খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে।

ঘটনার তিনদিন পর সদর থানার টুটপাড়া সার্কুলার রোডের বাসিন্দা শাহাজাহানের ছেলে মোঃ ইসমাইলকে বাড়ির অদূরে ডেকে নিয়ে গুলি ও কুপিয়ে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। ঘটনার দু’দিন অতিবাহিত হলেও পুলিশ এখনও কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি। শুক্রবার রাতে পরিবারের পক্ষ থেকে ৮ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতনামা কয়েকজনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়। হত্যাকারীরা নিহতের পরিবারের পরিচিত। পরিবারের অন্য সদস্যদের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে তারা মুখ খুলতে সাহস পাচ্ছেন না।

তাছাড়া একটি বিশেষ বাহিনীর নামে খুলনার বিভিন্নস্থানে চলছে নীরব চাঁদাবাজি। থানায় এসব ঘটনায় অভিযোগ জানিয়ে কোনো প্রতিকার পায়না ভুক্তভোগীরা। জানালেও আবার বিপদে পড়তে হয়। তাই জীবনের নিরাপত্তার কথা ভেবে হয়রানির শিকার হওয়া এসকল মানুষ দাবিকৃত টাকা সন্ত্রাসীদের হাতে তুলে দিচ্ছেন।

খুলনার আইনশৃঙ্খলা অবস্থার অবনতিতে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন নাগরিক নেতা এ্যাড. বাবুল হাওলাদার। তিনি বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর পরই খুলনার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি খুবই অস্থিতিশীল। তবে আমরা মনে করেছিলাম সময়ের ব্যবধানে পরিস্থিতির উন্নয়ন হবে। কিন্তু উন্নতি হচ্ছে না। বিশেষ করে হত্যার মতো ঘটনা প্রতিনিয়ত ঘটছে এবং মাঝে মাঝে দেখি প্রতিদিন গড়ে একজন করে খুন হচ্ছে। দুঃখজনক হলেও সত্য, যারা হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িত তাদের কোনোভাবে আইনের আওতায় আনা যাচ্ছে না। পুলিশ এখানে ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছেন। এখন প্রশ্ন পুলিশের এখানে কোনো গাফিলতি আছে, না কি এখানে পেশাদারিত্বের অভাব আছে। না কি শ্েযর মধ্যে ভূত রয়েছে। সে প্রশ্নটি আমাদের মাঝে বরেবারে আসছে।

তিনি আরও বলেন, সময়ের ব্যবধানে যারা অপরাধী তারা উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করে অপরাধমূলক কার্যক্রম ঘটানোর পর তারা সটকে পড়ে। সন্ত্রাসীরা যদি প্রশাসনের থেকে আগাম হয়ে থাকে তাহলে তারা ধর ছোঁয়ার বাইরে থাকবে এটা স্বাভাবিক। পুলিশের মধ্যে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা, তাদের পেশাদারিত্বে আন্তরিকতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা। এগুলোর মধ্য দিয়ে পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে। এছাড়া অন্যান্য পথ আছে, সেগুলোর মাধ্যমে নগরী থেকে সন্ত্রাসী কার্যকলাপ দূর করা যেতে পারে।

কেএমপি অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মুহম্মদ শাহনেওয়াজ খালেদ বলেন, অপরাধপ্রবণ এলাকা হিসেবে খুলনার ব্যাপক পরিচিতি রয়েছে। তাছাড়া যতগুলো হত্যাকাণ্ড হয়েছে, সেগুলো মাদক ও এলাকার আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করেই হয়েছে। আর এগুলো একদিনে হয়নি। মাদক ও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে অভিযান চালানো হচ্ছে। খুব শিগগিরই সন্ত্রাসী কার্যকলাপ নিপাত হবে বলে তিনি মনে করেন।

 

খুলনা গেজেট/এনএম




আরও সংবাদ

খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন